চট্টগ্রাম বিভাগ
বান্দরবান জেলা
বান্দরবান জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল।
এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে চট্টগ্রাম বিভাগে অবস্থিত। এটি পার্বত্য
চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্তর্গত। চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান জেলার দূরত্ব ৭৫কিলোমিটার। বান্দরবান জেলার আয়তন
৪৪৭৯ বর্গ কিলোমিটার। বান্দরবান সদর মারমা রাজা অংশুপ্রু-এর বাসভূমি। এই অঞ্চলের অন্য দুইটি জেলা হল রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি। বান্দরবান জেলা
এর নৈসর্গিক বৈচিত্র্যের জন্য বাংলাদেশের একটি গুরূত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত
হয়েছে।
ভৌগোলিক সীমানা
বাংলাদেশের তিনটি পার্বত্য জেলার মধ্যে একটি বান্দরবান, বাংলাদেশের সবচেয়ে কম জনবসতিসম্পন্ন স্থান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ সাকাহাফং (৪৩০০ মিটার) । দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং (৮৮৩ মিটার) এবং সর্বোচ্চ খাল রাইখিয়াং এই জেলায় অবস্থিত। এখানকার অন্য দুটি দর্শনীয় স্থান হলো চিম্বুক পাহাড় ও বগা লেক।এখানকার সড়কপথে সংযোগগুলো হচ্ছে চিম্বুক - রুমা, বান্দরবান - রোয়াংছড়ি - রুমা, আজিজনগর - গজালিয়া - লামা, খানহাট - ধোপাছড়ি - বান্দরবান, বান্দরবান - চিম্বুক - থানচি - আলীকদম - বাইশারী - ঘুনধুম এবং চিম্বুক - টঙ্কাবতী - বারো আউলিয়া।
বাংলাদেশের ভিতরে, বান্দরবানকে ঘিরে রয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি। অন্যদিকে রয়েছে মায়ানমারের চিন প্রদেশ এবং আরাকান প্রদেশের সীমান্ত।
উপজেলা সমূহ
- আলিকদম উপজেলা
- থানচি উপজেলা
- নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা
- বান্দরবান সদর উপজেলা
- রুমা উপজেলা
- রোয়াংছড়ি উপজেলা
- লামা উপজেলা
নদনদী
সাঙ্গু নদ এই জেলার অন্যতম নদী সাঙ্গু নদী যা সাংপো বা শঙ্খ নামেও পরিচিত। এই নদীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি বাংলাদেশের একমাত্র নদী যা দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রবাহিত হয়। অন্যান্য নদীর মধ্যে রয়েছে মাতামুহুরী এবং বাঁকখালী নদী।ইতিহাস
মূল নিবন্ধ: পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস
বান্দরবান পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশ। এই অঞ্চলটি ১৫৫০
সালের দিকে প্রণীত বাংলার প্রথম মানচিত্রে বিদ্যমান ছিল। তবে এর প্রায় ৬০০ বছর আগে ৯৫৩
সালে আরাকানের রাজা এই অঞ্চল অধিকার করেন। ১২৪০ সালের দিকে ত্রিপুরার রাজা এই এলাকা দখল করেন।
১৫৭৫ সালে আরাকানের রাজা এই এলাকা পুণর্দখল করেন, এবং ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত অধিকারে রাখেন। মুঘল সাম্রাজ্য ১৬৬৬ হতে
১৭৬০ সাল পর্যন্ত
এলাকাটি সুবা বাংলার অধীনে শাসন করে। ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই এলাকা নিজেদের
আয়ত্বে আনে। ১৮৬০ সালে এটি ব্রিটিশ
ভারতের অংশ হিসাবে যুক্ত হয়। ব্রিটিশরা এই এলাকার নাম দেয় চিটাগাং হিল
ট্র্যাক্ট্স বা পার্বত্য চট্টগ্রাম। এটি চট্টগ্রাম জেলার অংশ হিসাবে বাংলা
প্রদেশের অন্তর্গত ছিলো। ১৯৪৭ সালে এই এলাকা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৭১ সালে
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটি বাংলাদেশের জেলা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। আশির
দশকের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি জেলা- রাঙামাটি, বান্দরবান, ও খাগড়াছড়ি-তে বিভক্ত করা হয়।নামকরণ
বান্দরবান জেলার নামকরণ নিয়ে একটি কিংবদন্তি রয়েছে। এলাকার বাসিন্দাদের প্রচলিত রূপ কথায় আছে অত্র এলাকায় একসময় বাস করত অসংখ্য বানর । আর এই বানরগুলো শহরের প্রবেশ মুখে ছড়ার পাড়ে পাহাড়ে প্রতিনিয়ত লবণ খেতে আসত। এক সময় অনবরত বৃষ্টির কারণে ছড়ার পানি বৃ্দ্ধি পাওয়ায় বানরের দল ছড়া পাড় হয়ে পাহাড়ে যেতে না পারায় একে অপরকে ধরে ধরে সারিবদ্ধভাবে ছড়া পাড় হয়। বানরের ছড়া পারাপারের এই দৃশ্য দেখতে পায় এই জনপদের মানুষ। এই সময় থেকে এই জায়গাটির পরিচিতি লাভ করে "ম্যাঅকছি ছড়া " হিসাবে । অর্থ্যাৎ মার্মা ভাষায় ম্যাঅক অর্থ বানর আর ছিঃ অর্থ বাঁধ । কালের প্রবাহে বাংলা ভাষাভাষির সাধারণ উচ্চারণে এই এলাকার নাম রুপ লাভ করে বান্দরবান হিসাবে । বর্তমানে সরকারি দলিল পত্রে বান্দরবান হিসাবে এই জেলার নাম স্থায়ী রুপ লাভ করেছে। তবে মার্মা ভাষায় বান্দরবানের প্রকৃত নাম "রদ ক্যওচি ম্র"।ভাষা ও সংস্কৃতি
সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা প্রচলিত। এছাড়াও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, লুসাই, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, খেয়াং, খুমী, পাংখুয়া ইত্যাদি প্রচলিত।প্রধান উৎসব
বান্দরবানের মারমাদের বর্ষবরণ উৎসবের নাম সাংগ্রাই। এছাড়া বড় উৎসবের মধ্যে রয়েছে ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে বা প্রবারণা পূর্ণিমা। এছাড়া ঈদ-উল ফিতর, ঈদ-উল আযহা, দূর্গা পূজাও সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়।দর্শনীয় স্থান
- বুদ্ধ ধাতু জাদি: বান্দরবন শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে বালাঘাটায় অবস্থিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ মন্দির। স্থানীয়ভাবে স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত। এটি স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত পেলেও এটি স্বর্ণ নির্মিত নয়। মূলত সোনালী রঙের জন্যেই এটির নাম হয়েছে স্বর্ণমন্দির।এটা থেরাবেড়া বৌদ্ধমন্দিরটি ৬০ মিটার উঁচু পর্বতের শীর্ষদেশে অবস্থিত। মন্দিরটি দক্ষিণপূর্ব এশীয় স্থাপত্যশৈলীতে তৈরী করা হয়েছে এবং এখানে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ মূর্তিটি আছে। সন্ধ্যা ছয়টার পরে মন্দিরে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ। মন্দির চত্ত্বরে শর্টপ্যান্ট, লুঙ্গি এবং জুতা পায়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। পাহাড়ের চূড়ায় দেবতাপুকুর নামে একটি লেক আছে।
- শৈল প্রপাতঃ বান্দরবন থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে থানচি যাওয়ার পথে মিলনছড়ি নামক স্থানে চমৎকার এই জলপ্রপাতটি অবস্থিত। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এটার রক্ষণাবেক্ষনের দ্বায়িত্বে আছে।
- মেঘলা এবং নীলাচলঃ বান্দরবন থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে কেরানিহাট যাওয়ার পথে মেঘলা পর্যটন স্পট অবস্থিত। এখানে একটি মিনি সাফারী পার্ক, চিড়িয়াখানা এবং ঝুলন্ত সেতু আছে। জেলা প্রশাসন মেঘলার কাছে টাইগারপাড়ায় নীলাচল নামে পর্যটন স্পট গড়ে তুলেছে।
- রাজবিহার এবং উজানিপাড়া বিহারঃ স্থানীয়ভাবে বৌদ্ধ মন্দিরসমূহ কিয়াং এবং বিহার নামে পরিচিত। জাদিপাড়ায় অবস্থিত রাজবিহার খুবই সুপরিচিত। উজানিপাড়ায় অবস্থিত উজানিপাড়া বিহারটিও উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান।
- চিম্বুক পাহাড় এবং উপজাতীয় গ্রামঃ বান্দরবন শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের অন্যতম উঁচূ শৃঙ্গ চিম্বুক পাহাড় অবস্থিত। চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশে বম নৃগোষ্ঠীর গ্রাম দেখতে পাওয়া যায়। অল্প কিছুদূরে ম্রোদের গ্রাম অবস্থিত। শহর থেকে এক দিনেই চিম্বুক পাহাড় এবং বম ও ম্রো গ্রাম ঘুরে আসা সম্ভব।
- নীলগিরি এবং থানচিঃ নীলগিরি অন্যতম উঁচু পাহাড় এবং বাংলাদেশ সৌন্দর্য্যময় পর্যটন স্পট। বান্দরবন শহর থেকে ৪৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এখানে একটি রিসোর্ট আছে। সেনা কর্মকর্তাদের সহায়তায় এখানে বুকিং সম্পন্ন করতে হয়। এখানে রেস্টুরেন্ট, হেলিপ্যাড, সুসজ্জিত কটেজ ইত্যাদির ব্যবস্থা আছে। বিদেশী পর্যটকগনের এখানে অবস্থানের উপর নিষেধাজ্ঞা আছে।
- বগালেকঃ বগাকাইন লেক নামেও পরিচিত। ছোট ছোট গ্রাম এবং পাহাড়কে পাশ কাটিয়ে বয়ে চলেছে নান্দনিক এই জলাশয়টি। বগালেক বাংলাদেশের সব থেকে সৌন্দর্যময় প্রাকৃতিক লেক। বান্দরবনের রুমা সদর উপজেলা থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত লেকটির আয়তন ১৫ একর। লেকের নীল পানি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। লেকটির তৈরী হওয়ার পিছনে অনেক লোকগল্প প্রচলিত আছে। শীত মৌসুমে বগালেকে পর্যটকের ভিড় উপচে পড়ে। বর্ষাকালে বগালেক এলাকায় ভ্রমন কঠিন হয়ে পড়ে। বগালেকের আশপাশে বম এবং খুমি নৃগোষ্ঠীর লোক বাস করে।
- অন্যান্য স্থানঃ প্রান্তিক লেক, জীবননগর এবং কিয়াচলং লেক।
রুমা উপজেলার নামকরণের ইতিহাস জানতে চাই।
উত্তরমুছুন