শনিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৬

বাংলাদেশের জেলাসমূহের ইতিহাস_ [ শরিয়তপুর জেলা_২ ]



"বাংলাদেশের জেলাসমূহের ইতিহাস_ [ শরিয়তপুর জেলা_ ]"
  • মুগল যুগ
মুগলদের রাজত্বের সময়ে (১৫৭৬-১৭৫৭) সম্রাট আকবরের নির্দেশে ১৫৭৪ সালে মুরাদখান নামে এক সেনাপতির নের্তৃত্বে দক্ষিণ-পুর্ব বাংলা অভিযান হয়।আকবর নামার বিবরণ অনুযায়ী ঐ সেনাপতি ফতেহবাদ (ফরিদপুর) ও বাকেরগঞ্জ দখল করেন। জনাব মুরাদ খান এরপর ফরিদপুরেই থেকে যান এবং ছয় বছর পর এখানেই তার মৃত্যু হয়। ফরিদপুর হতে ১৩ মাইল দূরে খান খানাপুরেই খুব সম্ভব তার বাসস্থান ছিল। পরবর্তীতে তাঁর ছেলেরা মুকুন্দ নামক এক হিন্দু জমিদারের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে এক ভোজের নিমন্ত্রণে এসে নিহত হন।
আকবরের সময়েও মূলতঃ এ অঞ্চল মুগলদের দখলে যেতে পারেনি। এ অঞ্চল তখন প্রধানতঃ কতিপয় মুসলমান ও হিন্দু স্থানীয় প্রধানদের দ্বারা শাসিত হতো। ইংরেজ ব্যবসায়ী রালফ ফিচ, যিনি বাংলার এ অঞ্চল ভ্রমন করেন, তিনি উল্লেখ করেন যে এখানে তখন বহু বিদ্রোহী ছিল যারা আকবরের শাসনকে গ্রহণ করে নি। রালফ ফিচের মতে ‘‘এখানে অনেক নদী, দ্বীপ থাকার ফলে বিদ্রোহীগণ একস্থান হতে অন্যত্র পালিয়ে বেড়াতো যার ফলে আকবরের অশ্ব বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে টিকতে পারতো না’’এ সময় বাংলার শাসকগণই মূলতঃ বারো ভূঁইয়া নামে খ্যাত যাদের মধ্যে ঈশা খান প্রসিদ্ধ হয়ে আছেন।
শরীয়তপুর -এর নড়িয়া থানার কেদারপুর নামক স্থান পূর্বে পদ্মা নদী-বিধৌত অঞ্চল ছিল। বারো ভূইঁয়াদের দুজন ভূইঁয়া চাদঁ রায় ও কেদার রায় এ অঞ্চলের শাসক ছিলেন। কেদার রায় মানসিংহের সেনাপতির সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ইহার ফলে তিনি নিহত হন। মসনদ ই আলা ঈশা খানই অন্যান্য রাজাদের প্রধান ছিলেন যার রাজত্ব ভাটিঅর্থাৎ বক্ষ্মপুত্র, মেঘনা ও সুন্দরবনের এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
বহুবারই দিল্লীর মুগল সম্রাট আকবর বাংলার এ অঞ্চল দখল করার জন্য শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। তথাপি তার পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীরের বাংলার গভর্ণর ইসলাম খার (১৬০৮-১৬১৩) সময়েই মূলতঃ এ দেশে মুগল রাজত্বের ভিত্তি হয়। তখন হতেই শরীয়তপুর অঞ্চলসহ বাংলার এ এলাকা মুগলদের পতন পর্যন্তই তাদের দখলে ছিল। ইসলাম খানের পর একুশজন গভর্ণর ১৬১৩ হতে ১৭৫৭ পর্যন্ত এ অঞ্চল শাসন করেন। এ সময়কাল ইতিহাসে শান্তি ও সমৃদ্ধির সময় হিসেবেই পরিচিত। তবুও এ সময়ে এ অঞ্চলের মানুষ পর্তুগীজ জলদস্যুদের সহায়তা প্রাপ্ত মগ ও আরাকানদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। নওয়াব শায়েস্তা খার আমলে (১৬৬৩-৭৮) ও (১৬৭৯-৮৮) মগ ও পর্তুগীজগন শায়েস্তা খানের এক অভিযানে নির্মুল হয় , যার ফলে তাদের শক্ত ঘাঁটি চট্রগ্রাম ও সন্ধীপের পতন হয়।
শায়েস্তা খাঁর সময়ে এদেশ খুবই শান্তি ও সমৃদ্ধিতে অতিবাহিত হয়। তার সময় টাকায় আট মন চাল পাওয়া যেতো।শায়েস্তা খাঁর পর ১৭০৩ হতে ১৭১৬ সাল পর্যন্ত নওয়াব মুর্শিদ খান অত্যন্ত দক্ষ মুগল গভর্ণর হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি এ জেলাসহ নিকটবর্তী অঞ্চলের ভূমি প্রশাসনের পুনর্গঠন করেন এবং জায়গীর প্রথা প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্থ ও কর সংগ্রহের ব্যাপারে উন্নত পদক্ষেপ গ্রহন করেন। ১৭৫৭ সালের সেই পলাশির মর্মান্তিক পরিণতির পূর্ব পর্যন্ত নওয়াব সিরাজউদ্দৌলা এ জেলা সহ বাংলার স্বাধীন নওয়াব হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।
  • বৃটিশ যুগঃ
পলাশীর যুদ্ধে লর্ড ক্লাইভ সিরাজদ্দৌলাকে পরাজিত করার পর ১৭৬৫ সালে এ জেলা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সৃষ্ট প্রশাসনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। শরীয়তপুর সহ ফরিদপুরের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে ঢাকা নিয়াবত গঠন করা হয়। ঢাকা নিয়াবত একজন নায়েব সুবাদার বা নাইব নাজিম ঢাকাকে কেন্দ্রস্থল হিসেবে গঠন করে শাসন পরিচালনা করেন। ঢাকার নায়েব নাজিমের আওতায় প্রায় পচিঁশ হাজার বর্গমাইল অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক এলাকা পরিচালিত হতো।
১৭৯৩ সাল হতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয়। ঐ সময়ে হতে শরীয়তপুর জেলা অঞ্চলসহ বৃহত্তর ঢাকা, বাকেরগঞ্জ এলাকা ঢাকা জামালপুর নামে ঢাকাকে কার্য্যালয় স্থাপন করে একটি জেলা গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এ বিশাল এলাকার জেলাকে প্রয়োজনের তাগিদেই ভাগ করা হয়। ১৮০৭ সালে ঢাকা জামালপুরের জেলা সদর ফরিদপুরে স্থানান্তরিত হয় এবং ঢাকা শহর ও বর্তমান ঢাকা জেলা পূর্বোক্ত ঢাকা জামালপুর জেলা হতে বাদ দেওয়া হয়। ১৮১৫ সালে ফরিদপুর জেলা একজন সহকারী কালেক্টরের অধীনে জেলা রূপে প্রকাশ পায় এবং ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত মুগল ম্যাজিষ্ট্রেট ও ডেপুটি কালেকটরের আওতায় শাসন চলে। পরবর্তীতে ১৮৫৯ সালে এ ব্যবস্থার অবসান করে একজন জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের ও কালেকটরের অধীনে আনা হয়। তখন ফরিদপুর জেলার আয়তন ছিল ১৩১২ বর্গমাইল।
শরীয়তপুর জেলা পূর্বে বৃহত্তর বিক্রমপুর এর অংশ ছিল। ১৮৬৯ সালে প্রশাসনের সুবিধার্থে ইহাকে বাকেরগঞ্জ জেলার অংশ করা হয়। কিন্তু এ অঞ্চলের জনগণের আন্দোলনের মুখে ১৮৭৩ সালেই এ অঞ্চলকে মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্গত করে ফরিদপুর জেলার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ১৮৫৭ সালের ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের সরাসরি কোন প্রতিক্রিয়া এ অঞ্চলে পড়েনি। তবে এ যুদ্ধ কোম্পানীর প্রশাসনের অবসান ঘটিয়ে গ্রেট বৃটেনের মহারাণী ভিক্টোরিয়ার সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ উপমহাদেশকে নিয়ে আসা হয় যার ফলে শরীয়তপুর জেলাও বৃটিশ রাজ্যের সরাসরি প্রশাসনের আওতায় পড়ে।
ভাইসরয় লর্ড কার্জনের সময় ১৯০৫ সালে বাংলাকে দুটো ভাগে বিভক্ত করা হয়। এ বিভক্ত বাংলার ইতিহাসে সুদুর প্রসারী ফল বিস্তার লাভ করে।নবগঠিত পূর্ব বঙ্গ ও আসাম রাজ্য যেখানে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন সে অঞ্চলে মুসলিমগণ শিক্ষা, চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে লাগলেন। কিন্তু হিন্দুগণ ইহা মেনে নিতে পারলেন না। ১৯০৬ সলে শরীয়তপুর সহ বৃহত্তর ফরিদপুরের হিন্দুগণ এর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াঁলেন। তারা এ বিভক্তি বিরোধী আন্দোলন সৃষ্টি করলেন এবং স্বদেশী আন্দোলন গড়ে তুললেন। নতুন প্রদেশের গভর্ণর স্যার বেনফিল্ড ফুলার এ আন্দোলন দমানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন। তা সত্বেও আন্দোলন অধিকতর গতিশীল হলো। ফলস্বরুপ ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে এ বিভক্তি রহিত করতে হয়। ইহাই ইতিহাসে বংগভংগ আন্দোলন নামে খ্যাত।
এর পর ক্রমে ক্রমে শরীয়তপুরের অঞ্চল সহ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে স্বাধীনতা সংগ্রামের সুত্রপাত হয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয় রাজনৈতিক দলের কর্মীরাই এ জেলায় সক্রিয় ছিলেন। এমনকি ১৯১০ হতে ১৯৩৫ সালের দিকে এ অঞ্চলের বহু বিপ্লবী সক্রিয়ভাবে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য অংশ নেন। লোনসিংএ জন্মগ্রহণকারী বিপ্লবী পুলিনবিহারী দাস এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন