শরিয়তপুর জেলা
শরিয়তপুর জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক
অঞ্চল।
উপজেলা
সমূহ
- শরিয়তপুর সদর উপজেলা
- ডামুড্যা উপজেলা
- নড়িয়া উপজেলা
- ভেদরগঞ্জ উপজেলা
- জানজিরা উপজেলা
- গোসাইরহাট উপজেলা
ইতিহাস
জেলা হিসেবে ১৯৮৪ সালে আত্মপ্রকাশ
করলেও এ অঞ্চলটি সৃষ্টির প্রথম হতেই বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায়
সকল ব্যাপারেই বিকশিত হতে থাকে। ইতিহাসের আদিকাল হতেই বিভিন্ন সামন্ত প্রভু ও রাজা
দ্বারা এ অঞ্চল শাসিত হয়ে এসেছিল। আদিকালে শরীয়তপুরের এ অঞ্চল ‘বংগ’ রাজ্যের অধীনে ছিল। ‘বংগ’ পদ্মা নদীর দক্ষিণে বদ্বীপ অঞ্চলে বিস্তৃত তৎকালীন
রাজ্যের নাম। এটি তৎকালীন ভাগীরথী এবং পুরাতন ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর
দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের (৩৮০ খৃঃ - ৪১২
খৃঃ) রাজত্বকালে প্রখ্যাত কবি কালিদাসের ‘রঘুবানসা’ গ্রন্থে তিনি এ
অঞ্চলকে গঙ্গানদীর প্রবাহের দ্বীপ দেশ বলে আখ্যায়িত করেন, যার অধিবাসীগণ
জীবনের সকল কর্মকান্ডে নৌকা ব্যবহার করতো। এমনকি যুদ্ধেও নৌকার
ব্যবহার ছিল। এ অঞ্চলের জনসাধারণ নৌ বিদ্যায় পারদর্শী ছিল। পরবর্তীতে বদ্বীপ
অঞ্চল ক্রমে ক্রমে দক্ষিণে সরে যায় এবং ব্রক্ষ্মপুত্র, গঙ্গা ও
অন্যান্য নদী বাহিত পলি দ্বারা এ অঞ্চল গঠিত হয়।
- গুপ্ত যুগ(৪র্থ শতক থেকে ৫৪৪ খৃষ্টাব্দ)
গুপ্তবংশের রাজত্বের পূর্ববর্তী বেশ
কিছু কাল এ অঞ্চলের ইতিহাস ছিল কিছুটা অষ্পষ্ট। সমুদ্রগুপ্তের (৩৪০-৩৮০ খৃঃ) আলনাবাদ
সামন্তের শিলালিপি ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময়ের কতিপয় স্বর্ণমুদ্রা
আবিষ্কারের ফলে এটা প্রমাণিত হয় যে, এ অঞ্চল গুপ্ত রাজবংশের অধীনস্থ এলাকা ছিল। বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালিপাড়া সদর হতে তিন চতুর্থাংশ মাইল দূরে গোয়াখোলা গ্রামে সোনাকান্দুরী নামক এক মাঠ খননকালে প্রাপ্ত মুদ্রায় এ সকল তথ্য আবিষ্কৃত হয়।
পরবর্তীকালে তাম্র থালা আবিষ্কার এবং
তার উপর খোদাই করা মিঃ এফই পারগিটার কর্তৃক পাঠোদ্বারকৃত বক্তব্যে বুঝা যায় যে, ৬ষ্ঠ শতকে
বংগের এ অঞ্চল অপর একটি রাজবংশ দ্বারা পারিচালিত হয়েছিল।মিঃ
পারগিটারের মতে আনুমানিক ৫৩১ ও ৫৬৭ খৃষ্টাব্দে প্রস্ত্ততকৃত দু’টি তাম্র
থালাতে লিপিবদ্ধ বক্তব্যে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ধর্মাদিত্য
নামক এক রাজা এ অঞ্চল শাসন করেন। তৃতীয় অপর একটি তাম্র থালার লিপিতে প্রাপ্ত তথ্যে
রাজা গোপালচন্দ্র এ অঞ্চলের শাসক ছিলেন তার আভাস পাওয়া যায়। ডঃ হর্ণলে
ধর্মাদিত্যকেই সম্রাট যশোধর্মন হিসেবে বর্ণনা দেন, যিনি একজন
ন্যায় ও ধার্মিক রাজা ছিলেন এবং এ কারণেই তিনি ধর্মাদিত্য নামে পরিচিত
ছিলেন। চতুর্থ তাম্র থালা যা কোটালিপাড়ার নিকটবর্তী ধাগড়াহাটিতে আবিষ্কৃত হয়েছে
তার শিলালিপি উদ্ধারের ফলে এটা প্রমাণিত হয় যে, গুপ্ত
সাম্রাজ্যের পতনের পর ৬১৫ হতে ৬২০ খৃষ্টাব্দ সময় কালে ‘সমাচারদের’ নামক একজন
স্বাধীন রাজা এ অঞ্চল শাসন করেন। মিঃ পারগিটারের সাথে সমসাময়িক ভারতীয় বিশেষজ্ঞ
বাবু রাধা গোবিন্দও এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। সমাচারদের গুপ্ত বংশের বাইরের
রাজা যিনি শশাঙ্কের শাসন কালের পূর্ব পর্যন্ত এ অঞ্চল শাসন করেছেন।
প্রখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬৩০ হতে ৬৪৩
সালের মাঝে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন যখন হর্ষবর্ধন ছিলেন ভারতের
ক্ষমতার শীর্ষে। ঐ সময় তাঁর লেখাতেও জানা যায় যে, সপ্তম শতকের মাঝামাঝি
সময় এ ‘বংগ’ হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৬৪৭ খৃষ্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর
পর তার সাম্রাজ্য বিভিন্ন খন্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং ‘বংগের’ এ জেলা সহ বিভিন্ন স্থানে স্বাধীন
রাজাগণ তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। এরপর বেশ কিছুকাল এ অঞ্চল
কোন কোন রাজা দ্বারা শাসিত হয়েছে তার ঐতিহাসিক তথ্যাদি অপর্যাপ্ত। কিন্তু
কিছু তাম্র ফলকের বক্তব্য হতে জানা যায় যে, ‘খাদগাস’ রাজতন্ত্রের অধীনে এ অঞ্চল ৬৫০ খৃষ্টাব্দ হতে ৭০০ খ্রষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসনাধীন ছিল।
শরীয়তপুর জেলার জন্য এটা অত্যন্ত
গৌরবের বিষয় যে এ জেলার দুটি স্থান ইদিলপুর ও কেদারপুরে এবং বর্তমানে
মুন্সিগঞ্জের রামপাল অঞ্চল হতে আবিষ্কৃত তাম্র ফলকের খোদাইকৃত বক্তব্য হতে
জানা যায় যে, এ অঞ্চল ‘চন্দ্রা’ নামক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী শাসকগণ দ্বারা পরিচালিত হতো। দশম
শতাব্দী হতে একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় এ অঞ্চল ঐ রাজগোষ্ঠি কর্তৃক
শাসিত হয়েছিল।
১০৮০ খৃষ্টাব্দ হতে ১১৫০ খৃষ্টাব্দ
সময়কাল ঢাকার বিক্রমপুর হতে ‘বর্মন’ নামক হিন্দু পরিবার এ অঞ্চলকে শাসন করেন। এদের মধ্যে
বজবর্মন, জাতা বর্মন, হরি বর্মন, সামালা বর্মন ও ভোজা বর্মনের নাম উল্লেখযোগ্য। সন্ধ্যাকর
নন্দী রচিত ‘রামচরিতা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ১০৮২ হতে ১১২৪ সাল নাগাদ রামপাল উত্তর বঙ্গ শাসন করেন। এ রামপালই ঐ সময় পূর্ব বঙ্গের শাসক একজন বর্মন রাজা, খুব সম্ভব দ্বিতীয় রাজ জাতা বর্মনকে এ অঞ্চল শাসন করার
কর্তৃত্ব প্রদান করেন। এ বর্মন রাজগোষ্ঠী অর্ধ স্বাধীনভাবে এ জেলা
সহ পূর্ব বঙ্গের অঞ্চল পরবর্তীতে সেন রাজবংশ কর্তৃক বিতাড়িত হওয়ার
পূর্ব পর্যন্ত শাসন করেন।
এরপর শুরু হয় সেন বংশের রাজত্ব। সেন
বংশের তৃতীয় রাজা বিজয়সেন (খৃঃ ১০৯৭-১১৬০) শরীয়তপুর অঞ্চলের শাসক ছিলেন। বিজয়সেনই
বংগের দক্ষিন পূর্বাঞ্চল হতে বর্মন শাসকদের এবং উত্তরাঞ্চল হতে ‘পাল’ রাজবংশকে উৎখাত করেন। সময়টি দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। তার উত্তর সূরী বল্লাল সেন (খৃঃ ১১৬০ হতে ১১৭৯) একজন পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন যার সুখ্যাতি সর্বত্র বিস্তৃত ছিল। বিজয়সেন ও বল্লালসেন দুজনই শিবের পূজা করতেন এবং তারা পরোপকারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বল্লালসেন আঠারো বছর রাজত্ব করেন এবং তার পর তিনি তার পুত্র লক্ষণসেনের (খৃঃ ১১৭৮ হতে ১২০৬) হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। রাজা লক্ষণসেন ১২০৪ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলের শাসক ছিলেন। ঐ বছরই মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী বাংলা আক্রমন করেন এবং সেন রাজাদের রাজধানী নদীয়া দখল করেন। এর ফলে এ বয়োবৃদ্ধ রাজা রাজধানী হতে পলায়ন করে ঢাকার বিক্রমপুরে অবসর নেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরগণ কয়েক যুগ এ অঞ্চলে রাজত্ব করেন। বংশধরগণের মধ্যে বিশ্বরুপসেন ১২০৬ হতে ১২২০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যকাল পর্যন্ত সেনগণ বিনা বাধায় রাজত্ব করেছিলেন। সেনগণ ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিক্রমপুর হতে তাদের শাসন ক্ষমতা হারান। ঐ সময় দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার (কুমিল্লা-নোয়াখালী) শাসক, দেব রাজবংশের
প্রতিষ্ঠাতা দামোদর দেবের বংশধর দশরথদেব সেন রাজবংশকে উৎখাত করে শরীয়তপুর অঞ্চলসহ এ এলাকার দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। তখনকার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বিক্রমপুর হতে প্রদত্ত দশরথ দেবের অদ্যাবধি থালা (ক্ষমতা প্রদান পত্র) হতে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দশরথদেবই হচ্ছেন জানামতে শেষ হিন্দু রাজা যিনি শরীয়তপুর এলাকা সহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বাংলাকে শাসন করেন এবং এর পরেই এ অঞ্চল মুসলমানগণের শাসনে চলে আসে।
- মুগল পূর্ব যুগ (চতুর্দশ শতক হতে ১৫৭৫ সাল)
স্যার উইলিয়াম হান্টারের ঢাকা জেলা
পরিসংখ্যান বিবরণী পুস্তকে প্রফেসর ব্লকম্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে
যে, ১২০৩-০৪ সালের দিকে মুসলমানগণ কর্তৃক বাংলা দখল হলেও মূলতঃ আজকের
বাংলাদেশ অঞ্চলসহ পূর্বাঞ্চলের এ এলাকা ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ বল্লাল সেনের
বংশধরগণ সম্রাট বলবনের নাতী কর্তৃক সোনারগাঁও দখল না করা পর্যন্ত শাসন করে এসেছিলেন।
১৩৩০ সালে মুহম্মদ বিন তুগলক পূর্ব বংগ দখল করেন এবং এ অঞ্চলকে তিনটি
প্রদেশে ভাগ করেন। লাখানুতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও। সোনারগাঁও এর গভর্ণর ছিলেন তাতার
বাহরাম খান। ১৩৩৮ সালে বাহরাম খানের মৃত্যুর পর তারই অস্ত্রবাহী
ফখরুদ্দিন এ অঞ্চলের ক্ষমতা দখল করে মুবারক শাহ উপাধি নিয়ে দশ বছর
শাসন করেন। ১৩৫১ সালে সামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ এবং তার পুত্র সিকান্দার
শাহ কর্তৃক সমস্ত বাংলা পুনরায় একত্রিকরণ করা হয়। সোনারগাঁও
ক্ষমতাসীনদের প্রধান কেন্দ্রস্থল হওয়াতে প্রায়ই এ অঞ্চল বিভিন্ন বিদ্রোহের
শিকার হয়েছিল। পরবর্তীতে সিকান্দার শাহর পুত্র আজম শাহ এর উত্তরাধিকারী
হন। এরপর আজম শাহর উত্তরাধীকারীগণ রাজা খান কর্তৃক উচ্ছেদ হন। ফলে
পুর্বাঞ্চলীয় জেলা সমূহ রাজা খানদের দখলে চলে যায়। কিন্তু ১৪৪৫ সালের দিকে
ইলিয়াস শাহের বংশধর মাহমুদ শাহ (প্রথম) কর্তৃক বাংলা আবার একীভুত হয় এবং
তিনি ১৪৮৭ সাল নাগাদ দেশ শাসন করেন। এই সময় বাংলার ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ
অঞ্চল নিয়ে জালালাবাদ এবং ফতেহবাদ প্রদেশ গঠন করা হয়। মিঃ ভিনসেন্ট
স্মিথের মতে, হোসেন শাহ ১৪৯৩ হতে ১৫১৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত এ দেশ শাসন
করেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ বাংলার মুসলিম রাজা। প্রফেসর
ব্লকম্যানের মতে, হোসেন শাহ প্রথমে ফতেহবাদের (বৃহত্তর ফরিদপুর) ক্ষমতা
দখল করেন এবং সেখানে তার প্রথম মুদ্রা ছাপানো হয়।
ফতেহবাদ হোসেন শাহের প্রধান শহর ছিল যা
কিনা বর্তমানের ফরিদপুর শহর। জালালউদ্দিন ফতেহশাহ নামক লাকনুতি প্রদেশের শাসকের
নামানুসারে ফতেহবাদ নামকরণ হয়। ফতেহবাদ ফরিদপুর, ঢাকা, বাকেরগঞ্জ, দক্ষিণ
শাহবাজপুর ও সন্দ্বীপ এলাকা নিয়ে গঠিত একটি সরকার বা বিভাগ ছিল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন